প্রবন্ধ - রচনা : আপনজনের মেলা টুসুমেলা।

 ভূমিকা: 

দক্ষিণ বাঁকুড়ায় কংসাবতী নদীতীরবর্তী একটি গ্রাম পরকুল। খাতড়া থেকে রানিবাঁধের বা ঝিলিমিলির বাসে উঠলে নামতে হবে আটকুড়ার মোড়ে বা ঘোড়াধরা হাটে। বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন জায়গা যেমন ডিহর, বিষ্ণুপুর, পরকুলে এই মেলা বসে। তারকেশ্বরে গাজনমেলা, জয়দেব-কেঁদুলীর মকরস্নান মেলা কিংবা মাহেশের রথের মেলার মতোই বিখ্যাত পরকুলের টুসুমেলা। উর্বরা শক্তির আরাধনায় আয়োজিত কৃষিকেন্দ্রিক এই পরব আসলে মধ্য আর পশ্চিম রাঢ়ের গ্রাম্য নরনারীর স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব। পরকুল মেলা একদিনের। কংসাবতী নদীর চরে এই মেলা বসে। মেলা যেখানে হয়, সেখানে নদীর জল আটকে পড়ে তৈরি হয়েছে এক দহ বা দিঘি, সেই দহেই পুণ্যার্থীরা স্নান করেন।

আপনজনের মেলা টুসু মেলা

মেলার বর্ণনা: 

পৌষ সংক্রান্তির দিনে এখানে জড়ো হন ২০/২৫ হাজার নরনারী। সেদিনই আবার মকরস্নান। টুসু ভাসানো আর মকরস্নানের পুণ্যতিথিকে কেন্দ্র করেই এই মেলার আয়োজন। দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ দলবেঁধে টুসুমূর্তি মাথায় নিয়ে টুসুগান গাইতে গাইতে মেলায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে থাকে বাঁশি, সানাই প্রভৃতি নানান বাদ্যযন্ত্র। পৌষমাসের শেষ দিনটিতে টুসু পরবের সমাপ্তি। একেই তাঁরা উৎসবের আকার দেন বাজনায়, নাচে, গানে। ছেলেরা ছেলেদের দলে ভিড়ে গানবাজনায় বিভোর, মেয়েরা তাদের নিজেদের দলে মজে আছে। তাঁদের সঙ্গে থাকে রঙিন কাগজের তৈরি বড়ো বড়ো চৌদল। তার ভেতরেই থাকে টুসুমূর্তি। মাথায় চৌদল নিয়ে তাঁরা নাচেন। টুসুমূর্তিরও বৈচিত্র্যের শেষ নেই। তিনি কোথাও অশ্ববাহনা, কোথাও-বা ময়ূরবাহনা। ইদানিং রকেটবাহনা পিঠোপিঠি বসা জোড়া টুসুমূর্তিও দেখা যায়। আছে পঞ্চমুখী টুসুও।

মেলা সম্পর্কে কিংবদন্তী: 

শোনা যায়, এক জমিদার (মতান্তরে চৈতন্যদেবের সহচর) একটি বহুমূল্য লাঠি তৈরি করান। সেই লাঠিটা নিয়ে তিনি কলকাতায় যান। গঙ্গাস্নানের সময়ে লাঠিটা হারিয়ে যায়। তখন দুঃখ করে জমিদার বলেন, 'মাগঙ্গা, আমি স্নান করতে এলাম, আর আমার লাঠিটা হারিয়ে গেল জলে।' তারপর একদিন স্বপ্নে মাগঙ্গা বলেন, 'তুই পরকুলে যা, ওখানে কংসাবতী নদীতে স্নান কর।' মকরের দিন স্নান করে জমিদার লাঠিটা ফিরে পান। তাতে সবার বিশ্বাস হয়, মাগঙ্গা এই ঘাটেও প্রবাহিত হন। সেই থেকেই পরকুলে এই মেলা বসছে।

পরকুল মেলায় টসমূর্তির প্রাধান্য বিষয়ে রয়েছে আরও একটি কিংবদন্তী। পরপর দু-বছর পরকুল দহে স্নান করার সময় দুটি ছোটো মেয়ে ডুবে যায়। এতে অনেকেরই বিশ্বাস হয় যে, প্রতিবছর একটি মেয়ে এই পরকুল দহে অবশ্যই ডুবে যাবে। এই সংস্কারের বশে কিছু সম্প্রদায়ের মায়েরা মাটির তৈরি পুতুলকে কন্যা কল্পনা করে পরকুল দহে নিয়ে গিয়ে স্নানের পর ডুবিয়ে দিত। কালক্রমে এই মাটির পুতুলই 'টুসু' নামে পরিচিত হয়েছে।

উপসংহার: 

মেলার দিনে বহু ভাতের হোটেল, মিষ্টির দোকান বসে। মেলায় পাওয়া যায় জামাকাপড়, মাটির জিনিস, খেলনা, কাঠের জিনিস, পাথরের বাসনপত্র, ছিপ-বঁড়শি, মাটির হাতি-ঘোড়া প্রভৃতি। আকাশবাতাসে ভেসে বেড়ায় জাগরণী, আহ্বান, পূজা-নিবেদন, বিদায়, পুনরাগমন ও বাস্তব ঘটনানির্ভর বহু গান। দেবী ও মানুষের ব্যবধান টুসুগানে প্রকট হয় না কখনোই। টুসু সকলের মা, সকলের কন্যা। টুসুমেলা তাই আপনজনের মেলা। সবজাতির মিলনমেলা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url