বাংলা প্রবন্ধ - রচনা : পুতুল নাচের কথা

 ভূমিকা: 

প্রাচীনকাল থেকেই পুতুলনাচের কদর। সে-সময়ের পুতুলদের গড়ন, সাজপোশাক আর ভাবভঙ্গি এখনকার মতো ছিল না। তবে তখনকার মতো এ যুগেও প্রযুক্তিনির্ভর পুতুলের কাজ হল মানুষকে হাসানো, কাঁদানো, তাকে মুগ্ধ করা। অনেকের মতে, পুতুলনাচের জন্ম ভারতে, অভিনয়ের কলাবিদ্যা আবিষ্কারেরও আগে। ধীরে ধীরে তা অন্য সব দেশের সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

জনপ্রিয়তার কারণ: 

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে-থাকা অঞ্চলেও পুতুলনাচের জন্য রঙ্গমঞ্চ, পুতুল তৈরির সামান্য উপকরণ আর তার সাজপোশাকের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। মানুষের মনে থাকা অভিনয়ের সুপ্ত ইচ্ছা পুতুলনাচের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এখানেও নাটকের মতোই মনোরঞ্জন, শিক্ষা, অভিনয় এবং সামাজিক কল্যাণের ধারণাগুলি একসঙ্গে জড়িত।

পুতুলনাচের পদ্ধতি ও বিষয়:

 পুতুলনাচকে আকর্ষক করে তুলতে দরকার সুন্দর রঙিন পুতুল আর জমজমাট একটি কাহিনি। এর গল্পটি হবে সুন্দর, আগ্রহ জাগাবে। নাটকীয়তাই এর প্রাণ। দর্শক কখনোই আগে থেকে এর পরিণতি সম্বন্ধে অনুমান করতে পারবেন না। সেখানে অভিনয়ের সঙ্গে থাকবে হাস্যরস, ব্যঙ্গ, কৌতুক আর গান-বাজনা। গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত জনপ্রিয় কাহিনি, লোকশ্রুতি, কিংবদন্তী, নীতিকথা, মহাকাব্য বা পুরাণের কাহিনিকে পুতুলনাচে রূপ দেওয়া হয়।

পুতুলনাচের সামাজিক উপযোগিতা: 

যুগে যুগে ধর্মপ্রচারকেরা পুতুলনাচের মাধ্যমে ধর্মকথা আর উপদেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এভাবে নিরক্ষর মানুষও সহজে তা বুঝতে পেরেছে। আধুনিক সময়ে বিজ্ঞানের নানান বিষয় অনেক সহজে পুতুলনাচের মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য, কৃষি, সাক্ষরতা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদানে পুতুলনাচ অত্যন্ত কার্যকরী। সরকারি নীতি ও পরিকল্পনার মূল কথাগুলি এর মাধ্যমে গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া যায়। এভাবে পুতুলনাচ গণসংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। পুতুলনাচে দর্শকেরা আনন্দ পেতেই আসেন। ফিরে যান আনন্দ, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সঞ্চয় করে। ছোটোরা তো পুতুলনাচ দারুণ উপভোগ করে। পুতুলনাচিয়েরা পর্দার আড়ালে থাকলেও কাহিনিতে তাঁদের নিজেদের কথা আর ভাবনার প্রতিফলন ঘটে।

পুতুলের বৈচিত্র্য:

 বহু ধরনের পুতুল রয়েছে-দস্তানাপুতুল, সুতো টেনে নাচানো পুতুল, ছড়িপুতুল, ছায়াপুতুল প্রভৃতি। রাজস্থান, ওড়িশা, অন্ধ্রে সুতোটানা পুতুলের চল বেশি। ছড়িপুতুল বাংলাদেশের অনন্য বৈশিষ্ট্য। মালাবার, অন্ধ্র আর কর্ণাটকে বেশি প্রচলন ছায়াপুতুলের।

পুতুলনাচের প্রসার:

 পুতুলনাচ এমন একটি শিল্প যা চোখে দেখার, কানে শোনার। অভিনয়, নৃত্য আর সংগীতের মিশেল আনন্দের মায়াজাল ছড়ায়। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর বিশেষ মূল্য রয়েছে। বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ আজও নিজের বৈশিষ্ট্যে অম্লান। জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড-সহ ইউরোপের বহু দেশে পুতুলনাচ প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীন মিশর এবং গ্রিসের সংস্কৃতিতেও এর পরিচয় মেলে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, চিন, জাপান, জাভা, সুমাত্রা প্রভৃতি দেশে প্রাচীনকালে পুতুল নাচের মাধ্যমে ধর্মীয় গাথা প্রচার করা হত। ভারতে পুতুলনাচের প্রসারে মুম্বাইতে 'ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব পাপেট্রি', 'ভারতীয় নাট্যসংঘ ওয়ার্কশপ', আমেদাবাদের 'শ্রেয়স ইস্কুল' ও 'দর্পণ একাডেমি', উদয়পুরের 'ভারতীয় লোককথা মণ্ডল' ও কলকাতার 'চিলড্রেন্স লিটল থিয়েটার'-এর প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য।

উপসংহার: 

পুতুলনাচ যৌথশিল্প। কণ্ঠশিল্পী, অলংকারশিল্পী আর অভিনয়শিল্পীর সমবেত প্রয়াসেই এই শিল্পকলার সার্থকতা। কালজয়ী এই শিল্প-ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের অবশ্যকর্তব্য।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url