বাংলা প্রবন্ধ/রচনা : প্রযুক্তিবিজ্ঞান ও আমরা
ভূমিকা:
দৈনন্দিন জীবন ও প্রযুক্তি:
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সকালে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে প্রযুক্তিবিজ্ঞানের ভূমিকা। আলো, পাখা, টেলিভিশন, রেডিয়ো, ফ্রিজ, হিটার, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইস্ত্রি, গ্যাস ওভেন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন-সবেতেই প্রযুক্তির প্রভাব। ঘরের বাইরেও একই অভিজ্ঞতা। ট্রেন, বাস, এরোপ্লেন, বড়ো বড়ো কলকারখানা, জমিচাষের ট্রাক্টর, বীজ বোনা, ফসল কাটা আর শস্য ঝাড়াইয়ের মেশিন-সবই প্রযুক্তিবিজ্ঞানের অবদান। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিবিজ্ঞানের অবদান অসীম।
গণমাধ্যম ও প্রযুক্তিবিজ্ঞান প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে গণমাধ্যমগুলি মানুষের কাছে অনেক বেশি খবর আর তথ্য অনেক কম সময়ে পৌঁছে দিচ্ছে। মুদ্রণ এবং প্রকাশনার জগতেও অসাধারণ অগ্রগতি ঘটিয়েছে প্রযুক্তি। উন্নত হয়েছে সম্প্রচার ব্যবস্থাও। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবস্থা গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যে বিপ্লব এনেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রযুক্তির কল্যাণে সারা বিশ্ব আমাদের চোখের সামনে হাজির হয়েছে।
মহাকাশ ও পরমাণু গবেষণায় প্রযুক্তিবিজ্ঞান:
প্রযুক্তির সাহায্যে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে কৃত্রিম উপগ্রহ। চন্দ্র-মঙ্গল-শুক্রগ্রহে অভিযান চলেছে। এগিয়ে চলেছে মহাকাশ সংক্রান্ত বহুমুখী গবেষণা। পারমাণবিক শক্তির অসীম সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন কাজে তাকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিজ্ঞানই প্রধান অবলম্বন। ভারতের তারাপুরে স্থাপিত হয়েছে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকেন্দ্র।
কম্পিউটার ও প্রযুক্তিবিজ্ঞান:
কম্পিউটার আধুনিক জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর সাহায্যে মানুষ ঘরে-বাইরে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এবং নির্ভুলভাবে বহু জটিল ও দুরূহ কাজ অনায়াসে করতে পারছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটিও ক্রমশ উন্নত হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তিবিজ্ঞান ও ভারত:
সুপ্রাচীনকাল থেকেই গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, স্থাপত্য, ধাতুবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ভারত অত্যন্ত উন্নত। আধুনিক ভারতে প্রযুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানসাধনায় জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, সি. ভি. রমন, এইচ. জি. ভাবা প্রমুখ সারা বিশ্বের স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেছেন। মহাকাশবিজ্ঞান, পরমাণু গবেষণা, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ, সমুদ্রবিজ্ঞান, খনিজসম্পদ, ইলেকট্রনিকস-এমনই নানান বিষয়ে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিরলস গবেষণায় মগ্ন। বিশেষত মহাকাশ গবেষণায় ISRO-র তত্ত্বাবধানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করে চলেছে। ১৯৮০ সালে সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রচেষ্টায় 'রোহিণী' উপগ্রহটি সাফল্যের সঙ্গে উৎক্ষিপ্ত হয়। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর মঙ্গলের পথে পাড়ি জমায় ভারতের স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান 'মার্স অরবিটার'। মহাকাশ-
প্রযুক্তিতে দক্ষতা দেখিয়ে মহাকাশে মানুষও পাঠিয়েছে ভারত। সামুদ্রিক প্রাণী, উদ্ভিদ, সমুদ্র আর সমুদ্রজাত আরও বহু জিনিস সম্পর্কে এতদিনের না জানা তথ্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে প্রযুক্তিবিজ্ঞানের সহায়তায়।
উপসংহার:
মানবসভ্যতাকে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছে প্রযুক্তিবিজ্ঞান। কিন্তু অগ্রগতির রথে চড়ে মানুষ যেন অশুভবৃদ্ধির বশে প্রযুক্তিকে কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার না করে সে বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার। উন্নতির লোভে প্রকৃতিকে যেন আঘাত না করা হয়, সে বিষয়ে সকলকেই সজাগ থাকতে হবে। নয়তো মানুষের এত গর্বের সভ্যতা তার নিজের হাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
