বাংলা প্রবন্ধ/রচনা: একটি গাছ একটি প্রাণ

 ভূমিকা: 

সৃষ্টির আদিযুগ থেকেই গাছের সঙ্গে মানুষ ঘনিষ্ঠ বন্ধনে জড়িয়ে রয়েছে। গাছ মানুষকে দিয়েছে তার বেঁচে থাকার রসদ অক্সিজেন, গ্রহণ করেছে কার্বন-ডাইঅক্সাইড। গাছের কাছে মানুষ পেয়েছে খাদ্য ছাড়াও আরও নানান উপকরণ। গাছ তার বন্ধু হয়ে, প্রতিবেশী হয়ে থেকেছে চিরকাল। প্রকৃতির উদার স্পর্শে মানুষ তার বসতি রচনা করেছে। তপোবনে গাছের ছায়ায় গড়ে উঠেছে শিক্ষার আয়োজন। উপনিষদে বর্ণিত বৃক্ষবন্দনার সুরে রবীন্দ্রনাথও গাছের প্রশস্তি রচনা করেছেন-


            "অন্ধ ভূমিগর্ড হতে শুনেছিলে সূর্যের আহবান 

           প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ

           ঊর্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা।",

রবীন্দ্রনাথের এই বৃক্ষবন্দনা সমগ্র মানবজাতির হয়ে, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে।

একটি গাছ একটি প্রান

সভ্যতার ধাত্রী: 

উদ্ভিদই বিশ্বে প্রাণের প্রথম প্রকাশ। প্রাণের বিপুল বৈচিত্র্যকে সে আশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে। এভাবেই সভ্যতার ধাত্রীস্বরূপ হয়ে উঠেছে গাছ। মানুষের সভ্যতাই শুধু গাছের আশ্রয়ে বিকশিত হয়নি, অরণ্য হয়ে উঠেছে পশুপাখিরও নিশ্চিন্ত বাসস্থান। জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছে গাছই। এ ছাড়া ভূমিক্ষয়রোধে, বৃষ্টির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে, দুর্যোগ আটকাতে, মরুভূমির সম্ভাবনা প্রতিরোধে গাছের ভূমিকার কথা কে না জানে। মানুষের প্রাণরক্ষায়, তার জীবনজীবিকা নির্বাহেও গাছের অশেষ ভূমিকা রয়েছে। শিল্পজাত বহু সামগ্রী ও ওষুধের বহুবিচিত্র উপকরণ পাওয়া যায় গাছ থেকে।

গাছ কাটার পরিণাম: 

সভ্যতার অহংকারে মানুষ গাছের এই মঙ্গলময় অবদানের কথা নিতান্ত অকৃতজ্ঞের মতো ভুলে গেছে। নগরায়ণের মোহে সে হাতে তুলে নিয়েছে অরণ্যধ্বংসের হাতিয়ার, নির্বিচারে আঘাত হানছে বৃক্ষরাজ্যে। ত্বরান্বিত হচ্ছে সভ্যতা ধ্বংসের আয়োজন। প্রকৃতি ভারসাম্য হারাচ্ছে, বেড়ে চলেছে তাপমাত্রা। বিশ্ব উল্লায়ণের ফলে মেরুপ্রদেশের বরফ গলছে, বেড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর জলস্তর, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বিধ্বংসী বন্যা আর অনাবৃষ্টির কারণও হল নির্বিচারে বৃক্ষনিধন। অতিবেগুনি রশ্মি বিনাবাধায় বহুবিধ মারণব্যাধির কারণ হয়ে উঠেছে। নিরন্তর দূষিত হয়ে পড়ছে জল, বাতাস, মাটি। প্রকৃতি হয়ে পড়ছে ভারসাম্যহীন, শ্রীহীন।

বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ: 

ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করা ছাড়া প্রকৃতিকে রক্ষা করার অন্য কোনো উপায় নেই। বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যক শর্ত এখন বৃক্ষরোপণ। 'একটি গাছ একটি প্রাণ' এখন আর নয়, আজকের শপথ হোক, 'একটি গাছ অনেক প্রাণ'। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই সম্রাট অশোক, হর্ষবর্ধন, আকবর প্রমুখ সম্রাট পথের দু-ধারে বৃক্ষরোপণের আয়োজন করেছিলেন। ভবিষ্যদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে 'বৃক্ষরোপণ উৎসব'-এর সূচনা করেন। ১৯৫০ সাল থেকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও বনমহোৎসব বা বৃক্ষরোপণ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রসংঘ ২১ মার্চ দিনটিকে 'বনদিবস' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ব্লক ও পঞ্চায়েত, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা ও সংঘের পক্ষ থেকেও বৃক্ষরোপণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। বিশ্বজুড়ে অরণ্যসংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণের পক্ষে জোরদার লড়াই করে চলেছেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলি।

উপসংহার: 

বৃক্ষরোপণেই যেন আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ হয়ে না যায়। দেখতে হবে, তা যেন নিছক একটি উৎসবেই পরিণত না হয়। রোপিত গাছের যত্ন, দেখভালের দায়িত্বও নিতে হবে আমাদের। ছোটো গাছগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সর্বস্তরের মানুষকে সক্রিয় হতে হবে। সমস্ত মানুষকে একথা উপলব্ধি করতে হবে যে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে গাছের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url