উচ্চ মাধ্যমিক 4th sem বাংলা 'প্রার্থনা' কবিতার প্রশ্ন ও উত্তর। সাজেশন ২০২৭।

 রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর। (প্রতিটি প্রশ্নের মান ৮)

প্রশ্ন (১): ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি কীভাবে ভারতবর্ষকে স্বর্গে জাগরিত করার কথা বলেছেন, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো। 
অথবা, কবি ভারতবর্ষকে কোন স্বর্গে জাগরিত করার কথা বলেছেন?

উত্তর:

ভূমিকা :— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ৭২ নম্বর কবিতা হলো ‘প্রার্থনা’। এই কবিতায় কবি প্রাচীন ভারতের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি, বর্তমান ভারতকে পুনরায় সেই গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পরমেশ্বরের কাছে আন্তরিক প্রার্থনা জানিয়েছেন।

স্বর্গের পরিচয় :— কবি তাঁর কবিতায় যে স্বর্গের কথা বলেছেন, তা কোনো অলৌকিক বা কাল্পনিক জগৎ নয়। তাঁর কল্পনায় স্বর্গ হলো এমন এক আদর্শ সমাজ, যেখানে মানুষের চিন্তাভাবনা স্বাধীন, মন উদার এবং বিবেক উন্নত। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ জ্ঞান, বুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় সমৃদ্ধ ছিল। সেই সময় ভারত বিশ্বসভায় বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিল। কবি সেই আদর্শ ভারতকেই স্বর্গের প্রতিরূপ হিসেবে কল্পনা করেছেন।

উচ্চমাধ্যমিক বাংলা প্রার্থনা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রার্থনা পূরণের উপায় :— কবির মতে, বর্তমানে ভারতবাসী তাদের পূর্বের উদার মানসিকতা ও আদর্শ থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। তাই তিনি পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন কঠোর আঘাতের মাধ্যমে ভারতবাসীর মনের জড়তা, মোহ ও অজ্ঞতা দূর হয়। এই আঘাতের ফলে দেশবাসীর ঘুমন্ত চেতনা জাগ্রত হবে এবং তারা পুনরায় জ্ঞান, ন্যায় ও আদর্শের পথে পরিচালিত হবে। তাদের কর্মশক্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং সমস্ত বাধা অতিক্রম করে দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। এভাবেই ভারতবর্ষ তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে কবির কল্পিত আদর্শ স্বর্গরাজ্যে উন্নীত হতে পারবে।

প্রশ্ন (৩): “নিত্য যেখানে তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা”—‘তুমি’ কে? তাকে ‘নেতা’ বলা হয়েছে কেন বিশ্লেষণ করো।
অথবা, “তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা”—এখানে ‘তুমি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? কবি কেন তাকে মানুষের সমস্ত কর্ম, চিন্তা ও আনন্দের পরিচালক বা ‘নেতা’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন?
অথবা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতায় ‘তুমি’ বলতে কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে? এই কবিতায় কবি কেন তাকে ‘সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা’ বলেছেন, তা আলোচনা করো।

উত্তর:

‘তুমি’ কে :— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতায় ‘তুমি’ বলতে সর্বশক্তিমান বিশ্ববিধাতা বা ঈশ্বরকে বোঝানো হয়েছে। কবির দৃষ্টিতে তিনি অনাদি, অনন্ত ও অবিনশ্বর সত্তা, যিনি সমগ্র সৃষ্টির মূলে বিরাজমান এবং বিশ্বজগতের সবকিছুকে পরিচালনা করেন।

তাঁকে ‘নেতা’ বলার কারণ :— কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঈশ্বরকে মানুষের জীবনের প্রকৃত পথপ্রদর্শক হিসেবে কল্পনা করেছেন। ঈশ্বর মানুষকে সৎকর্মের পথে পরিচালিত করেন এবং তার চিন্তা ও চেতনাকে উন্নত করেন। তাই কবি তাঁকে ‘নেতা’ বলে অভিহিত করেছেন। এর কারণগুলি হলো—

১. সংকর্মের পথপ্রদর্শক :— ঈশ্বর মানুষকে সৎকর্মের পথে চলার প্রেরণা দেন। তাঁর নির্দেশিত পথে চলেই মানুষ ন্যায় ও কল্যাণের কাজ করতে পারে।

২. চিন্তার মুক্তিদাতা :— ঈশ্বর মানুষের মনকে সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করেন। তাঁর প্রেরণায় মানুষের চিন্তাভাবনা উদার ও স্বাধীন হয়ে ওঠে।

৩. সত্য ও ন্যায়ের প্রেরণাদাতা :— ঈশ্বর মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার শক্তি জোগান। তাঁর প্রেরণায় মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং নির্ভীকভাবে সত্যকে গ্রহণ করতে শেখে।

৪. আনন্দের উৎস :— ঈশ্বরের নির্দেশিত সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে চলার মধ্যেই প্রকৃত আনন্দ নিহিত রয়েছে। এই আনন্দ ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ত্যাগ, আত্মমুক্তি ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়।

উপসংহার :— সুতরাং, ঈশ্বর মানুষের সৎকর্ম, চিন্তা ও চেতনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেন। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘প্রার্থনা’ কবিতায় ঈশ্বরকে ‘নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রশ্ন (৪): “... যেথা নির্বারিত স্রোতে/দেশে দেশে দিকে দিকে কর্মধারা ধায়/অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়”—নির্বারিত স্রোতে দেশে দেশে দিকে দিকে কর্মধারা যেভাবে প্রবাহিত হয়, তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: ভূমিকা :— কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, মানবজীবন ও সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নিরন্তর কর্মপ্রবাহ। তাঁর মতে, এই কর্মধারা কখনো থেমে থাকে না, বরং সারা বিশ্বে অবিরাম গতিতে প্রবাহিত হয়। ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি বিশ্বব্যাপী এই কর্মপ্রবাহের চিত্র সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

অবিরাম গতিময়তা :— কবির দৃষ্টিতে পৃথিবীতে কর্মের ধারা কখনো স্তব্ধ হয় না। নদীর স্রোতের মতো তা নিরন্তর বয়ে চলে। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ নিজেদের কাজে নিয়োজিত থেকে এই গতিশীলতাকে সচল রাখে। মানুষের এই অবিরাম কর্মপ্রচেষ্টাই পৃথিবীকে জীবন্ত ও গতিশীল করে তুলেছে।

বিশ্বজোড়া বিস্তার :— কর্মপ্রবাহ কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তা দেশ থেকে দেশান্তরে এবং বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। মানুষের বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়েই বিশ্বজুড়ে পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কর্মের বিচিত্র রূপ :— পৃথিবীতে মানুষের কর্মের ধরন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কেউ কৃষিকাজ করেন, কেউ জ্ঞানচর্চা করেন, আবার কেউ শিল্প ও সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের উন্নতিতে অবদান রাখেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কাজে নিযুক্ত থাকলেও, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানবসভ্যতা ক্রমশ উন্নতির পথে এগিয়ে চলে।

পূর্ণতার সাধনা :— মানুষের কর্মপ্রবাহ কেবল দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং জীবনের পূর্ণতা অর্জনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, জীবনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

উপসংহার :— পরিশেষে বলা যায়, ‘প্রার্থনা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বব্যাপী কর্মপ্রবাহের নিরন্তর গতি, ব্যাপক বিস্তার ও বৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টাই পৃথিবী ও মানবসভ্যতাকে ক্রমাগত অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

প্রশ্ন (৫): ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি কী প্রার্থনা করেছেন? সেই প্রার্থনা কীভাবে পূরণ হতে পারে?
অথবা, ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবির প্রার্থনা কী এবং তা পূরণের উপায় কী?

উত্তর:

 কবির প্রার্থনা:—

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রার্থনা’ কবিতায় পরমেশ্বরের কাছে আন্তরিক আবেদন জানিয়েছেন, যেন তিনি ভারতবাসীর মনের জড়তা ও অলসতা দূর করেন। ভারতবাসী যেন সংকীর্ণ জ্ঞানচর্চা এবং অপ্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠানের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে। তারা যেন উন্নত আদর্শ, উদার মানসিকতা ও উচ্চ বিবেকবোধের অধিকারী হয়ে পৃথিবীতেই স্বর্গীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে—এটাই কবির একান্ত কামনা।

প্রার্থনা পূরণের উপায়:—
কবির মতে, ভারতবাসী তাদের অতীত গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। সেই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করার জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রয়োজন। কবির কাছে স্বর্গ বলতে কোনো অলৌকিক স্থানকে বোঝায় না; বরং উদার চিন্তাভাবনা, মুক্তবুদ্ধি এবং অবাধ জ্ঞানচর্চার মধ্যেই স্বর্গের প্রকৃত পরিচয় নিহিত। কবি বিশ্বাস করেন, ঈশ্বর যদি কঠোর আঘাতের মাধ্যমে ভারতবাসীর চেতনাকে জাগ্রত করেন, তবে তাদের মনের জড়তা ও সংকীর্ণতা দূর হবে। এর ফলে ভারতবাসী পুনরায় নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং এক উন্নত ও স্বর্গীয় জীবনাদর্শে প্রতিষ্ঠিত হবে। এভাবেই কবির প্রার্থনা সার্থক হয়ে উঠবে।


প্রশ্ন (৬): “জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি”—‘মুক্ত জ্ঞান’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? গৃহের প্রাচীর কীভাবে বসুধারে খণ্ড-ক্ষুদ্র করেনি, আলোচনা করে বুঝিয়ে দাও।
অথবা, ‘মুক্ত জ্ঞান’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে এবং কীভাবে জ্ঞানচর্চা গৃহের প্রাচীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না?

উত্তর:

‘মুক্ত জ্ঞান’-এর পরিচয়:—

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় ‘মুক্ত জ্ঞান’ বলতে এমন জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন, যা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বই থেকে অর্জিত জ্ঞান অনেক সময় খণ্ডিত ও সীমাবদ্ধ হতে পারে। অন্যদিকে, প্রকৃতি ও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রসারিত করে। এই জ্ঞান উদারতা ও স্বাধীন চিন্তার পথ দেখায় এবং সংকীর্ণতা ও মনের কলুষতা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখে। এটাই হলো প্রকৃত মুক্ত জ্ঞান।

যেভাবে গৃহের প্রাচীর বসুধাকে খণ্ড-ক্ষুদ্র করে রাখেনি:—
কবির মতে, বর্তমান ভারতবাসীর জ্ঞানচর্চা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ প্রাচীন ভারতে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ছিল উদার ও মুক্ত। তখন জ্ঞানকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতো না এবং শিক্ষাকে সংকীর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়নি। এর ফলে ভারতীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই বলা যায়, গৃহের প্রাচীর জ্ঞানচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; বরং মানুষের জ্ঞান ও চিন্তাভাবনা বিশ্বব্যাপী প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এভাবেই গৃহের প্রাচীর বসুধাকে খণ্ড-ক্ষুদ্র করে রাখেনি।

প্রশ্ন (৭): “যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি / বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি / পৌরুষেরে করে নি শতধা”—‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
অথবা, ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে এবং এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:

‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’:—

কবি ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’ বলতে সমাজে প্রচলিত অপ্রয়োজনীয়, কুসংস্কারপূর্ণ ও অবৈজ্ঞানিক আচার-অনুষ্ঠানকে বুঝিয়েছেন। মরুভূমির বালুরাশি যেমন মানুষের চলার পথে বাধা সৃষ্টি করে, তেমনই এইসব তুচ্ছ আচার-অনুষ্ঠান সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এগুলি মানুষের চিন্তাভাবনাকে সংকীর্ণ করে তোলে এবং সমাজের স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে।

তাৎপর্য:—
এই অংশের মাধ্যমে কবি প্রাচীন ভারতীয়দের সাহস, পৌরুষ ও দৃঢ় মানসিকতার পরিচয় তুলে ধরেছেন। প্রাচীন ভারতবাসীর মন ছিল ভয়মুক্ত এবং তাঁরা সাহসের সঙ্গে জীবনের নানা বাধা ও প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতেন। ভয় কিংবা লোভ তাঁদের আদর্শ ও কর্তব্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারত না। তাঁদের পৌরুষ ছিল লোহার মতো দৃঢ় ও অবিচল। কোনো সংকীর্ণ আচার-বিচার তাঁদের সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করতে পারেনি। তাঁরা দেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এবং প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। এই অংশে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন ভারতীয়রা ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আদর্শনিষ্ঠ; কোনো তুচ্ছ প্রথা বা সংকীর্ণতা তাঁদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

প্রশ্ন (৮): রবীন্দ্রনাথের ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি স্বদেশভাবনার কবিতা হিসেবে কতটা সার্থক, আলোচনা করো।

উত্তর:— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ৭২ সংখ্যক কবিতা ‘প্রার্থনা’ কেবল একটি আধ্যাত্মিক কবিতা নয়, এটি কবির গভীর স্বদেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনারও পরিচায়ক। পরাধীন ভারতের পটভূমিতে রচিত এই কবিতায় কবি দেশবাসীর মুক্তি ও জাতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন। নিচে কবিতাটিতে প্রকাশিত স্বদেশভাবনার সার্থকতা আলোচনা করা হলো।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্বদেশচেতনা:—
কবিতাটি এমন এক সময়ে রচিত হয়েছিল, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অত্যাচার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিটিশ-বুয়র যুদ্ধের নির্মমতা কবিকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি অন্য দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও নিজের দেশের পরাধীনতার যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন। তাই এই কবিতার আবেদন শুধু ভারতবর্ষের মানুষের মুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের দুর্দশার প্রতিবিম্ব:—
পরাধীন ভারতের সমাজজীবন তখন কুসংস্কার, অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা ও মানসিক জড়তায় আচ্ছন্ন ছিল। কবি তাঁর ‘প্রার্থনা’ কবিতায় দেশের এই দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি চেয়েছেন, ভারতবাসী যেন ভয় ও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আত্মমর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। দেশবাসীর এই মুক্তি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই কবিতাটির স্বদেশভাবনাকে গভীরতা দিয়েছে।

মুক্তির জন্য নির্ভীকতার সাধনা:—
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেবল রাজনৈতিক মুক্তিই যথেষ্ট নয়; মানুষের মন ও চিন্তাভাবনাকেও স্বাধীন হতে হবে। তাই তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে সত্যের পথে চলবে, স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করবে এবং সংকীর্ণতার সমস্ত বাধা অতিক্রম করবে। এই আদর্শের মাধ্যমে কবি দেশবাসীকে আত্মবিশ্বাস, সাহস ও আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছেন।

আচার-সর্বস্বতা থেকে মুক্তি:—
কবি উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রাচীন জীর্ণ প্রথা, অন্ধ সংস্কার এবং অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠান জাতির উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। এইসব সংকীর্ণতা মানুষের স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে ব্যাহত করে এবং সমাজের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে। তাই তিনি দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় প্রথার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে উদার, যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রগতিশীল মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়েই কবির সমাজসংস্কারমূলক স্বদেশচেতনা প্রকাশিত হয়েছে।

উন্নত মানবমর্যাদার প্রার্থনা:—
‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চাননি; তিনি চেয়েছেন মানুষের নৈতিক, মানসিক ও মানবিক উন্নতি। তাঁর কল্পিত স্বর্গরাজ্যে মানুষের মন থাকবে ভয়মুক্ত, মস্তক থাকবে উন্নত এবং জ্ঞানচর্চার পথ হবে অবাধ। সেখানে মানুষ সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য, যুক্তি ও মানবতার আদর্শে জীবন পরিচালনা করবে। এই আদর্শের মধ্য দিয়ে কবির স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বমানবতার ভাবনা একসূত্রে মিলিত হয়েছে।

উপসংহার:—
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতায় স্বদেশপ্রেম, জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সমাজসংস্কারের আদর্শ এবং বিশ্বমানবতার চেতনা সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কবি এমন একটি স্বাধীন ও উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষ ভয়, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে। তাই কবিতাটি আধ্যাত্মিক আবেদন হওয়ার পাশাপাশি এক গভীর স্বদেশভাবনারও সার্থক প্রকাশ।উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি স্বদেশচেতনা এবং জাতির মুক্তির জন্য এক গভীর ও সার্থক আবেদন।

প্রশ্ন (৯): ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির মূল বক্তব্যবিষয় নিজের ভাষায় লেখো।
অথবা, ‘প্রার্থনা’ কবিতার বিষয়বস্তু আলোচনা করো।

উত্তর:

ভূমিকা:—
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘প্রার্থনা’। এই কবিতায় কবি ভারতের অতীত গৌরব ও বর্তমান দুরবস্থার ছবি তুলে ধরেছেন। দেশবাসীকে সমস্ত সংকীর্ণতা ও জড়তা থেকে মুক্ত করে আবার গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন।

🟩 মূল বক্তব্য:—
কবির উপলব্ধি, বর্তমান ভারতবাসী তাদের সরলতা, সত্যনিষ্ঠা ও আদর্শ থেকে ক্রমশ দূরে সরে গেছে। তাদের মন দুর্বলতা, সংকীর্ণতা ও কলুষতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তারা সহজেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে এবং তাদের জ্ঞান সংকীর্ণতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। কবি চান, ভারতবাসী যেন পুনরায় নির্ভীক চিত্ত, উন্নত মস্তক ও মুক্ত জ্ঞানের অধিকারী হয়ে ওঠে। তারা যেন সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বজুড়ে জ্ঞান ও কর্মের অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি, অপ্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করে নিজেদের সাহস, আত্মবিশ্বাস ও পৌরুষে জেগে ওঠে। ঈশ্বরবিশ্বাসী কবি মনে করেন, ঈশ্বরই মানুষের কর্ম, চিন্তা ও আনন্দের মূল উৎস। তাই তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন কঠোর আঘাতের মাধ্যমে ভারতবাসীর চেতনাকে জাগ্রত করা হয়। এই আঘাত তাদের মনের জড়তা ও দুর্বলতা দূর করে নতুনভাবে জেগে উঠতে সাহায্য করবে। এর ফলে ভারতবাসী তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে উন্নত জীবনাদর্শে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

প্রশ্ন (১০): ‘প্রার্থনা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

অথবা, ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির নামকরণ কতটা সার্থক, তা আলোচনা করো।

উত্তর:

ভূমিকা:— সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা রচনার মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। একটি নামকরণ বিষয়বস্তুভিত্তিক, চরিত্রপ্রধান বা ব্যঞ্জনাধর্মী হতে পারে। ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির নামকরণ এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়।

নামকরণের সার্থকতা:— ‘প্রার্থনা’ শব্দের অর্থ হলো বিনম্র চিত্তে কিছু চাওয়া বা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা। এই কবিতায় কবি পরমেশ্বরের কাছে ভারতবর্ষের জন্য এমন এক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে বর্তমান ভারতের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবনতি ঘটেছে। তাই দেশবাসীর এই দুর্দশা দেখে তাদের মধ্যে প্রকৃত জীবনীশক্তি জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন। এই কবিতাটি কবির ভক্তিবিনম্র হৃদয়ের এক আন্তরিক ‘প্রার্থনা’ হয়ে উঠেছে। কবি পরমেশ্বরের কাছে সেই ভারতের জন্য প্রার্থনা করেছেন যেখানে মানুষ হবে নির্ভীক, উন্নতশির এবং মুক্ত জ্ঞানের অধিকারী। তাদের জ্ঞানচর্চা ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে। কবি অনুভব করেন যে, পরমেশ্বরই সকল কর্ম, চিন্তা ও আনন্দের উৎস। তাই তিনি তাঁর কাছে প্রার্থনা করেছেন যে, ঈশ্বর যেন কঠোর আঘাতের মাধ্যমে ভারতীয়দের চেতনাকে জাগ্রত করেন, যাতে তারা আবার তাদের প্রাচীন গৌরব ফিরে পায় এবং নতুন প্রাণশক্তিতে জেগে ওঠে। এই পুরো কবিতা জুড়েই কবির এই বিনম্র প্রার্থনাটি প্রকাশিত হয়েছে, তাই এর নামকরণ ‘প্রার্থনা’ সম্পূর্ণরূপে সার্থক।

প্রশ্ন (১১): “নিত্য যেথা তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা, নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ, ভারতের সেই স্বর্গে করো জাগরিত”—প্রসঙ্গসহ উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য আলোচনা করো।

অথবা, ঈশ্বরকে সকল কর্ম ও আনন্দের নেতা বলে কবি কেন মনে করেছেন? ভারতকে কোন স্বর্গে জাগরিত করার প্রার্থনা করা হয়েছে?

ভূমিকা:—
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ৭২ সংখ্যক কবিতা হলো ‘প্রার্থনা’। এই কবিতায় কবি পরাধীন ভারতবর্ষের দুরবস্থা এবং তার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের কথা তুলে ধরেছেন। দেশবাসীকে অজ্ঞতা, ভয় ও সংকীর্ণতার বন্ধন থেকে মুক্ত করে এক উন্নত সমাজ গড়ে তোলার জন্য তিনি পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন।

মূল বক্তব্য:—
কবির মতে, ভারতবাসী তাদের অতীতের সত্যনিষ্ঠা, আদর্শ ও মহত্ত্ব থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাদের মন দুর্বলতা, অজ্ঞতা ও সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তারা সহজেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে এবং তাদের জ্ঞানচর্চা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। কবি চান, ভারতবাসী যেন ভয়হীন মন, উন্নত মস্তক ও স্বাধীন চিন্তাশক্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। তারা যেন সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে অবাধ জ্ঞানচর্চা ও কর্মের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে নিজেদের অবদান রাখতে পারে। পাশাপাশি, অপ্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে চলে। কবি বিশ্বাস করেন, ঈশ্বরই মানুষের চিন্তা, কর্ম ও আনন্দের পরম উৎস। তাই তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন তাঁর কঠোর আঘাত ভারতবাসীর সুপ্ত চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। সেই আঘাতের মাধ্যমে তাদের মনের জড়তা, দুর্বলতা ও সংকীর্ণতা দূর হবে। ফলে ভারতবাসী নিজেদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে স্বাধীন, উদার ও উন্নত জীবনাদর্শে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে.

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url