প্রবন্ধ-রচনা : ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতার উপযোগিতা
ভূমিকা
ভূমিকা: সমস্ত প্রকৃতি ও প্রাণীজগৎ এক সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হয়ে আছে-ঋতুবৈচিত্র্য, জোয়ারভাটা, দিনরাত্রি, প্রাণীদের জীবনচক্র, জীববৈচিত্রা, জীবদের আন্তঃসম্পর্ক-এই সবই এক বিশ্বশৃঙ্খলার অধীন। কিন্তু পৃথিবীর সব থেকে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে মানুষের জীবনে এই শৃঙ্খলার বাড়তি গুরুত্ব আছে।
মানবজীবনে শৃঙ্খলার গুরুত্ব:
জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে অজস্র শাখায় মানুষের প্রতিদিনের যাত্রা, সেখানে তার সাফল্য সম্ভব হয়েছে তার শৃঙ্খলাবদ্ধতার কারণেই। শৃঙ্খলাবোধ ব্যক্তির নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে, যা সমাজকে স্বেচ্ছাচার ও নৈরাজ্যের হাত থেকে বাঁচায়। আর যে বিষয়টি ছাড়া এই শৃঙ্খলাবোধ সম্ভব নয় তা হল নিয়মানুবর্তিতা। নিয়মানুবর্তিতা কথাটির অর্থ নিয়মের প্রতি অনুগত থাকা। রাষ্ট্র, সমাজ, সংঘ সকলেই তার সদস্যদের জন্য কিছু আচরণবিধি তৈরি করে দেয়, পাশাপাশি ব্যক্তিমানুষের আত্মবিকাশের জন্যও প্রয়োজন কিছু নিয়মকে অনুসরণ করা। এককথায় শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কেই সমৃদ্ধ করে। ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনাচরণ থেকে তার সামাজিক সম্পর্ক, খেলার মাঠ থেকে পেশাগত জীবন-সর্বত্রই শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতার যে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতার গুরুত্ব:
ছাত্রজীবন যেহেতু ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতির সময়, তাই সেই জীবনকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য শৃঙ্খলার পাঠও এই সময়েই নেওয়া উচিত। ছাত্রসমাজ যদি শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় তাহলে ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। ফলে আদর্শ সমাজগঠনের পথ অনেক সহজ হয়ে যায়। শৃঙ্খলাবোধ এবং নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়েই ছাত্রছাত্রীরা ভবিষ্যতের যথার্থ নাগরিক হয়ে ওঠার শিক্ষা পায়। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে যোগ দেওয়ার উৎসাহও খুঁজে পায়, কারণ শৃঙ্খলা সময় ও জীবনের অপচয় বন্ধ করে। শৃঙ্খলাবোধ তাকে স্কুলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। নিজস্ব শৃঙ্খলা সহপাঠীর স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী যদি শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় তাহলে শিক্ষালয়ের পরিবেশও সুন্দর হয়ে ওঠে। এর ফলে শিক্ষাগ্রহণের পথ সুগম হয়।
ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলার শিক্ষা:
স্কুলের কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে একজন ছাত্র পায় নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা। সেখানে দেশ-বিদেশের মনীষীদের জীবনাচরণের কাহিনি থেকে সে বুঝে নিতে পারে জীবনে শৃঙ্খলার সার্থকতাকে। পারিবারিক জীবনে বাবা-মা এবং বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং তাঁদের অনুশাসনও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলো, সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলি, ড্রিল, স্কাউটিং, এনসিসি ইত্যাদিও ছাত্রদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলে। আধুনিকতার নামে সমাজে যখন মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় ঘটে চলেছে সেই সময় শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা সামাজিক স্থিরতা আনতে পারে, সুস্থ রুচিবোধ গড়ে তুলতে পারে। ছাত্রজীবনের শৃঙ্খলা শিক্ষা-পরবর্তী জীবনে যে আদর্শ মানুষ তৈরি করবে গোটা দেশ ও সমাজ তার সুফল পেতে পারে। শৃঙ্খলা এবং নিয়মের প্রতি আনুগত্য মানসিক স্থিরতাকে নিশ্চিত করে, যা শিক্ষাকে ভিতর থেকে গ্রহণ করতে সাহায্য করে। সমৃদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য এই শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার:
শৃঙ্খলা আসলে এক কঠোর জীবনসাধনা, যার সার্থকতা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, বোঝা যায় পরবর্তী সময়ে। শৃঙ্খলা মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে গড়ে তোলে, তাকে রূপ দেয় সেইভাবে, যেভাবে সমাজ একজন মানুষকে প্রত্যাশা করে।
